পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডক্টর রফিক ইসলাম


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : জুলাই ১৮, ২০২৩, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ /
পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডক্টর রফিক ইসলাম

গ্রন্হনা ও উপস্হাপনা : সারওয়ার খান

কার্বন ইমিশন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং শব্দগুলোর সাথে আমার সবাই কম বেশি পরিচিত। ইদানিং আরও যোগ হয়েছে কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন, কার্বন ক্রেডিট। একটু সহজ করে বলতে গেলে, পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই কার্বন ডাই-অক্সাইড বা CO2 এর অস্তিত্ব, প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। পৃথিবী সৃষ্টির সেই প্রথম থেকেই পরবর্তী কোটি কোটি বছর কার্বন ডাই-অক্সাইড এর আবরনের চাদরে পৃথিবী হয়েছে শীতল ও বাসযোগ্য। প্রানের উদ্ভব থেকে শুরু করে জীবনের বিকাশ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বাসযোগ্যতায় কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রেখেছে।
পরবর্তীতে মানব সভ্যতার বিকাশ, শিল্প বিপ্লব ও পরিবেশ বিনষ্টে মানব জাতির অবিবেচক কার্যকলাপে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড এর পরিমান বেড়ে গিয়ে উপকারী পর্যায় থেকে এখন মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ বছর থেকে কার্বন নির্গমনের বিপদ সংকেত জানিয়ে আসছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে আমরা এখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষতির শিকার হচ্ছি, যা সমগ্র বিশ্বের পরিবেশ বিপর্যয় আগামী প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে।

গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড এর পরিমান বৃদ্ধি এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করছে যা জীবনের বিকাশকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করবে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ বছর ধরে কার্বন নির্গমন সীমিত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান করছেন। কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন এমন একটি প্রাকৃতিক বা কৃত্তিম প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড আহরন করে কঠিন বা তরল আকারে ধরে রাখা হয়।
আর বিভিন্ন মাধ্যমে কার্বন নির্গমন সীমিত করবার জন্য প্রনদোনা হিসাবে কার্বন ক্রেডিট বাই ব্যাক প্রক্রিয়া চালু করে সকল স্তরে কার্বন নির্গমনকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসকল প্রক্রিয়ায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন বাংলাদেশী বংশদ্ভূত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটি সাউথ সেন্টারের মৃত্তিকা, জল ও বায়োএনার্জি এর প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডক্টর রফিক ইসলাম।
ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটি সাউথ সেন্টারের মৃত্তিকা, জল ও বায়োএনার্জি প্রোগ্রাম এর সামগ্রিক লক্ষ্য হল অর্থনৈতিক ভাবে কার্যকর, পরিবেশগত ভাবে সামঞ্জস্যপুর্ন এবং সামাজিক ভাবে গ্রহনযোগ্য পরিবেশ বান্ধব কৃষির বিকাশ ও পরিচালনা করা।

অধ্যাপক ডক্টর রফিক ইসলাম এর বিশেষীকরন এবং আগ্রহের ক্ষেত্র গুলো হলো: পরিবেশবান্ধব এগ্রিকালচার ও এগ্রোইকোসিস্টেম পরিষেবা, উচ্চমূল্যের ফসলের জৈব চাষ পদ্ধতি, কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন, কর্ষন ও কভার ক্রপ, মাটি ও পানির গুনাগুন ব্যাবস্হাপনা, প্রান্তিক মাটি ও জৈব উপাদান উৎপাদন, প্লান্ট ইনডিউসিং এর মাধ্যমে আ্যবায়োটিক ও বায়োকন্ট্রোল পরিষেবা ইত্যাদি।

অতি সম্প্রতি ডক্টর রফিক ইসলাম তার দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রচেষ্টায় উদ্ভাবিত কম খরচে মাটির গুনাগুন পরীক্ষার Field Test Kit এর প্যাটেন্ট লাইসেন্সিং চুক্তির স্বীকৃতি স্বরুপ ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে

Commercialization Achievement Award পেয়েছেন। তার উদ্ভাবিত মাটি পরীক্ষার Field Test Kit, Soil1com নামীয় স্প্রীংফিল্ড, ওহাইও ভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সারা বিশ্ব ব্যাপী মাঠ পর্যায়ে বাজারজাত করার ব্যাবস্হা নেওয়া হয়েছে। কিটটি ব্যাবহার করা সুবিধাজনক, নির্ভরযোগ্য ও একটি মাত্র রিয়েজেন্ট ব্যাবহার করে ১৫মিনিটের মধ্যে মাটির গুনাগুন কালার কোড চার্টের বা ফোনের Siol1 App এর মাধ্যমে জানা যাবে। তাৎক্ষনিক ভাবে মাঠ পর্যায়ে মাটির Soil Organic Matter, Nitrogen এবং Microbial Vitality সম্পর্কে জানা যাবে, যা Agricultural Productivity and Climate Change বিষয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

মি: রফিক ইসলাম ১৯৫৫ সালে ঢাকা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জন্মগ্রহন করেন। ঢাকা আরমানিটোলা আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ওয়েষ্ট এন্ড হাই স্কুল থেকে ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে নটরডেম কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল সাইন্স বিভাগে ভর্তি হয়ে থিসিস গ্রুপ থেকে ১৯৮২ সালে মাষ্টার্স ডিগ্রী শেষ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগে লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে থাইল্যান্ড ব্যাংকক এর Asian Institute of Technology থেকে Soil & Water Engineering এর Remote Sensing and Geographic Information System এ ME করেন।

পুনরায় ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল সাইন্স বিভাগে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন। ১৯৮৫-১৯৮৭ সালে অষ্ট্রেলিয়া সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে ME কোর্স শেষ করেন। অতঃপর ১৯৯০ সালে আমেরিকার University of Maryland at College Park এ PhD প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে, ৯৫ সালে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রাপ্ত হন।
১৯৯১-১৯৯৫ সালে PhD প্রগ্রামে Graduate Student হিসাবে অধ্যায়নকালীন সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে Graduate Teaching Assistant I Graduate Research Assistant হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৯৬-২০০১ সময়কালে Instructor হিসেবে Natural Resource Sciences & Landscape Architecture, University of Maryland at College Park, MD তে কর্মরত ছিলেন। ২০০২-অদ্যাবধি ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটির Soil, Water and Bioenergy Program at OSU-South Centers এ প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়াও ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটির School of Environment and Natural Resources এ স্নাতক ছাত্রদের শিক্ষাদান ও তত্তাবধানে অনুষদ সদস্যদের একজন হিসেবেও কাজ করছেন।

দুই ভাই ও ছয় বোন এর পরিবারে বাবা ছিলেন উচ্চ পদস্হ সরকারি চাকুরে। একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ঢাকা আজিমপুর সরকারি কলোনীতে। AIT তে অধ্যায়নকালীন সময়ে তাসমিনা রহমান এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ছেলে তাশফিক ইসলাম ও মেয়ে সারিয়া ইসলাম উভয়েই  Computer Science and Editorial Services এ গ্রজুয়েশন করে নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। স্ত্রী মিসেস ইসলাম ওয়াশিংটন ডিসি এর MedStar Hospital এ Microbiology Laboratory তে Quality Control Manager হিসেবে কর্মরত আছেন।

ডক্টর রফিক ইসলাম তার Commercialization Achievement Award এর সাথে আরও একটি উল্লেখযোগ্য এওয়ার্ড প্রাপ্ত হয়েছেন। Soil Organic Matter and Ecosystem Services Calculator (SOMCal software) ডেভেলপ করার জন্য ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃক Ohio Agricultural Research Development Center Directors Inventor Award (by OSU President Dr. Michael Drake) এ ভূষিত হয়েছেন। তার অবদান মূলক শিক্ষাদান, ফলিত গবেষনা এবং অনুষদেও পেশাগত উন্নয়ন এবং পশ্চিম আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়/প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শের জন্য ২০১৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস দ্বারা দুইবার পুরস্কৃত হন। এ ছাড়াও Mandela Washington Fellowship Mentor Award পাওয়ায় সম্প্রতি ডক্টর রফিক ইসলামকে US Congrass (House Representatives) এর পক্ষ থেকে Recognition and Congressional Award প্রদান করা হয়েছে।

ডক্টর রফিক ইসলাম এর প্রাপ্ত এ্যওয়ার্ড গুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি :

  • Ukrainian Academy of Science Award, 2023
  • American Council for International Education Award, Kazakhstan, 2019
  • Fulbright Teaching Fellowship to Turkey, 2014 – 2015.
  • Visiting Scholar, Chinese Academy of Agricultural Sciences, 2014 – 2020.
  • Manchester Whos Who, 2004 – 2005
  • American Society of Agronomy Award, 1997
  • FAO Fellowship, 1987
  • USAID Fellowship, 1986

বর্তমানে ডক্টর রফিক ইসলাম সক্রিয় গবেষনা ও শিক্ষা সহযোগিতায় Australia, Bangladesh, Burkina Faso, China, Egypt, France, Ghana, India, Israel, Japan, Kazakhstan, Pakistan, Russia, South Africa, Sweden, Ukraine and Uzbekistan এর সাথে নিয়োজিত আছেন।

ডক্টর রফিক ইসলাম এর সাথে আলাপচারিতায় বাংলাদেশ নিয়ে তার পরিকল্পনায় বর্তমানে জড়িত কার্যক্রমের ধারনা পাওয়া গেল। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Dhaka University, Bangladesh Agricultural University and Chittagong University) পরিবেশ ও তার প্রভাব নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষনার বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা জানা গেল।

ওহাইও ষ্টেট ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল অফিসের নির্দেশনায়, তিনি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা স্মারক তৈরিতে কাজ করছেন যাতে স্নাতক ছাত্র (PhD) ও তরুন অনুষদ সদস্যদের সক্রিয় গবেষনা ও শিক্ষাদান কার্যক্রমে তাদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য আনা যায়। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, দেশ ও দশের উপকারের নিমিত্তে শ্রম ও মেধাকে কাজে লাগালে উল্লেখযোগ্য উন্নতির দ্বার অবারিত।