চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ নুরুজ্জামান


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১১, ২০২৩, ১১:২৯ অপরাহ্ণ /
চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ নুরুজ্জামান

ওহাইও সংবাদ : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম পথ-প্রদর্শক নাট্য-আন্দোলনের নিষ্ঠাবান পৃষ্ঠপোষক বিশিষ্ট ক্রীড়ামোদী এবং শিল্প ও সংস্কৃতানুরাগী ছিলেন জনাব নুরুজ্জামান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ও নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে নুরুজ্জামানের স্থান সূচিহ্নিত। ১৯৭৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় প্রথম বাংলা ছায়াছবি নির্মাণের প্রচেষ্টায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন জনাব নুরুজ্জামান ও জনাব আবদুল জব্বার খান। এই দুই মহান ব্যাক্তির যৌথ প্রচেষ্টাতেই দেশের প্রথম সবাক ছায়াছবি “মুখ ও মুখোশ” নির্মিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে “মুখ ও মুখোশ” নির্মাণের কাহিনীকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায় বললে অত্যুক্তি করা হয় না। কারণ এখান থেকেই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের শুভ যাত্রা শুরু। “মুখ ও মুখোশ” নির্মাণের উদ্যোক্তাদের একনিষ্ঠ প্রয়াস আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে সর্বকালেই অনুপ্রাণিত করবে। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় প্রথম ছায়াছবি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ইকবাল ফিল্মস লিমিটেডের গোড়াপত্তন হয়। এই প্রতিষ্ঠানের দুই প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জনাব নুরুজ্জামান ও জনাব আবদুল জব্বার খান। ব্যাক্তিগত জীবনে তাঁরা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাদের পেশাও ছিল একই ধরণেরÑদুজনেই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। জনাব নুরুজ্জামান ও জনাব আবদুল জব্বার খান সে সময় সরকারী চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ঠিকাদারী ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন।

এই ইকবাল ফিল্মস লিমিটেড এর ব্যানারে জনাব আবদুল জব্বার খান রচিত ‘ডাকাত’ নাটকটি ‘মুখ ও মুখোশ’ নামে চিত্রায়ণের সিদ্ধান্ত করা হয়। এই উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে একখানা আইমো ক্যামেরা নিয়ে আসেন উদ্যোক্তাদের এক সহযোগী জনাব সরওয়ার হোসেন। কথা ছিল সরওয়ার হোসেন সাহেব ছবিটি পরিচালনা করবেন, কিন্তু পরে নানা ঝামেলায় তিনি তা পারেন নি। ফলে জনাব নুরুজ্জমান ডাইরেক্টর-ইন-চার্জ হয়ে কাজ শুরু করেন। আর নাটক পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকায় জনাব আবদুল জব্বার খান কোম্পানীর ডাইরেক্টর হিসেবে। ছবির সামগ্রিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর জনাব নুরুজ্জামানের ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও দুঃসাহসিক কর্মোদাগে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সংগে সংশ্লিষ্ট প্রায় সকলেই সে ইতিহাস জানা আছে।

‘মুখ ও মুখোশে’র সব শিল্পীরাই ছিলেন বাংলাদেশের দেশের অধিবাসী। ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে ছবির শুটিং শেষ হয় এবং এর ল্যাবরেটরী ও এডিটিং সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয় লাহোরের শাহনর ষ্টুডিওতে। ১৯৫৬ সালের ৩রা আগষ্ট ‘মুখ ও মুখোশ’ ঢাকায় মুক্তিলাভ করে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এভাবে জনাব নুরুজ্জামান ও জনাব আবদুল জব্বার খানের সম্মিলিত উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রথম ছায়াছবি নির্মাণের প্রচেষ্টা সফল হয়। জনাব নুরুজ্জামান ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ইকবাল ফিল্মস লিমিটেডের অন্যতম ডাইরেক্টর ছিলেন। ইকবাল ফিল্মস এর অফিস ছিল শান্তিনগর পোস্ট অফিসের কাছে, প্রবর্তিতে ইকবাল ফিল্মস শেয়ার বিক্রি করে, যার ধারাবাহিকতায় তখন অনেকেই শেয়ার হোল্ডার হন। এছাড়া তিনি বেঙ্গল ষ্টুডিওর একজন অংশীদার ছিলেন।

বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের এই অন্যতম পথিকৃৎ এদেশের নাট্য আন্দোলনের সংগেও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। দেশ বিভাগের পর থেকেই জনাব নুরুজ্জামান বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে বাংলা নাট্যোশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার এক শক্তিশালী আন্দোলনে প্রসংশনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেন? তাঁর উদ্যোগে ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দেশ বিভাগের অব্যবহিত পরে পরেই ‘ছেড়া তার’ ‘ঈশা খান’ প্রভৃতি নাটক ঢাকার রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়। জনাব আব্দুল জব্বার খান এই নাট্য-আন্দোলনে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ট সহযোগী ছিলেন।
মরহুম নুরুজ্জামান ক্রীড়ামোদী হিসেবেও অপরিচিত ছিলেন। তিনি ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সাহিত্য ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ উৎসাহী ও নিরব সাধক ছিলেন।

জনাব নুরুজ্জামান ছিলেন ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। আসামের ধুবড়ীতে তাঁর জন্ম। তাঁর শিক্ষা জীবন অতিবাহিত হয় প্রথমে ধুবড়ীতে ও পরে ঢাকায়। ১৯৭৫সালের ২৮ শে ডিসেম্বর সকাল ১১-৩০ মিনিটে ঢাকার পোষ্ট গ্রাজুয়েট হাসপাতালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহে …….. রাজেউন)। মৃত্যুর পূর্বে তিনি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন।
মরহুম নুরুজ্জামান স্কুল শিক্ষা জীবন ছিল আসামের ধুবরিতে, কারন ওনার বাবা ব্রিটিশ আমলে পুলিশ বড় কর্মকর্তা ছিলেন এবং বাবার চাকরীর সুবাদে শৈশবকাল কেটেছে আসামে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ করেন।

মরহুম নুরুজ্জামন একজন দক্ষ পিয়ানো বাদক ছিলেন এবং খুব ভালো আবৃত্তিও করতেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল উদার মনের মানুষ। সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রান এই মানুষটি নিজেই শুধু চর্চা করেন নি স্ত্রী জাহানারা বেগমকেও গোড়ে তুলেছিলেন অভিনয় শিল্পী হিসাবে। জাহানারা বেগম ছিলেন শিক্ষক কিন্তু স্বামীর উৎসাহে ১৯৫১- ১৯৫২ সালে কমলাপুর ড্রামাটিক এসোসিয়েশন উদ্যোগে মঞ্চায়িত নাটক ঈশা খাঁতে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে (স্বর্ণময়ি) ৫৪ তম রজনী পর্যন্ত সফলতার সাথে অভিনয় করেন। এই নাটকে নুরুজ্জামান নিজেও সম্রাট আকবরের ভুমিকায় অভিনয় করেন। পরবর্তিতে সন্তানের মৃত্যুতে অভিনয় জগত থেকে দুজনেই সরে যান।

এই দম্পতির তিন সন্তান বড় ছেলে ড. নূর ইয়াজদানী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বর্তমানে টেক্সাস ইউনিভারসিটিতে শিক্ষকতা করছেন। ছোট ছেলে মনজুর ইয়াজদানী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বর্তমান ফেসবুক এ কর্মরত এবং মেয়ে ড. জেসমিন জামান পেশায় চিকিৎসক ওহাইও তে ভাস্কুলার রেডিওলজিতে কর্মরত। নুরুজ্জামানের তিন সন্তান ই সংগীত অনুরাগি এবং চর্চাও করেন।