নানা রঙের দিনগুলি – রাশিদা কামাল


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪, ১১:৪১ অপরাহ্ণ /
নানা রঙের দিনগুলি – রাশিদা কামাল

জানুয়ারি মাস —– ঢাকা যাব। সাধারণত আমি জানুয়ারিতেই ঢাকা যাই। ডিসেম্বর মাস এলেই মনটা উচাটন হয়। দ্রিম দ্রিম শব্দ বাজে বুকের মাঝে। স্বভাবতই এ শব্দ আনন্দের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। আমি ওহাইওতে থাকি বড় ছেলে রথীর কাছে। ঢাকা গেলে পাই ছোট ছেলে রূপমকে। একই কথা। তবুও ঢাকার টানটা একটু বেশিই মনে হয়। কথাটা রথীকে অবশ্য বলি না। কারণ রথী বলবে আমি রূপমকে বেশি ভালোবাসি। এ কথার কোন উত্তর হয় না। কেবল বাবা মাই জানে সন্তানের ভালোবাসায় কোন তারতম্য হয় না। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করি কোন কারণে মন এত উচাটন হয়! কেন বুকের মাঝে দ্রিম দ্রিম শব্দ শুনতে পাই! উত্তর পেয়ে যাই সঙ্গে সঙ্গে। শেকড়ের টান! এ টান শুধু আমার ভেতরেই না, সবার ভেতরেই থাকে! দ্রিম দ্রিম শব্দ সবার মনেই বেজে ওঠে! আসলে প্রবাসী না হলে দেশের মর্ম বুঝতেই পারতাম না! আগে অনেক কিছুই ভালো লাগতো না
যা এখন লাগে। মাটির সোঁদা গন্ধ, বৃষ্টিভেজা রঙধনু, সবুজ দিগন্তরেখা, বহতা নদী, নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া গাঙচিল, শালিখের ওড়াউড়ি, মেহগিনি আর কাঁঠাল পাতার গাঢ় ছায়া, নদীর পাড়ের ভেজা বালিয়াড়ি, পাতার আড়ালে পাখিদের ডানা ঝাপটানোর মৃদু শব্দ — সবকিছু আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রাক-শারদীয় আর শারদীয় গন্ধ তো আছেই!
গতবছর এই জানুয়ারিতে ঢাকা গিয়েছিলাম। আমাদের কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাসির জানালেন একুশে ফেব্রুয়ারির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিচারক হতে হবে। উল্লেখ্য আমি এই সমিতির মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক ছিলাম বহু বছর। কাজটা তাই আমাকে করতে হতো। মাঠে যেতাম খুব উৎসাহের সাথে। নাসিরের কথায় আবার জেগে উঠলাম। প্রতিযোগিতা শেষ হলেও আমাদের গল্প শেষ হতো না । শূন্য মাঠে আমরা গল্প করতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এবার আবার ঢাকা যাচ্ছি ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে। আবার প্রতিযোগিতা দেখব। শহিদ মিনারে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাব। তারপর গল্প-গুজবে ভরিয়ে তুলব সময়টা।
একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে হলেই মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা। সে সময় দিনটি ছিলো একটা নিষিদ্ধ দিন। আমি তখন প্রাইমারি সেকশনে পড়ি। ভালো করে সবকথা মনেও নেই। তবে দিনটা যে অন্য রকম ছিলো তা বুঝতে পারতাম ভোরের প্রভাতফেরি শুনে। স্কুলে যেতাম। অ্যাসেমব্লিতে জাতীয় সঙ্গীতও গাইতাম। তারপর ক্লাসরুমে এসে বসতাম। একটু পর স্যার যখন ক্লাসে আসতেন তখন দেখতাম স্যারের মুখটা বেশ গম্ভীর। তখন বুঝতাম না স্যারের গম্ভীরতার কারণ। আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। আর বুঝতে শিখেছি সবকথা। মর্মে ধারণ করতে শিখেছি দেশপ্রেমকে। ভাষার অপমান অনেক বড় অপমান! কেননা জাতির পরিচয় নির্ণিত হয় ভাষার মাধ্যমে। তা না হলে পরিচয় অসম্পূর্ণই থেকে যায়! আর এভাবেই বুঝেছি স্যার কেন ক্লাসে এসে গম্ভীর থাকতেন! আসলে স্যারও চাইতেন না এ দিনে ক্লাস করতে।
সকাল আটটায় ক্লাস শুরু হতো। স্যারের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে আমরাও গম্ভীর হতাম। ক্লাস চলতো মন্থর গতিতে। উচ্ছ্বাসহীন ভঙ্গিতে। এর কিছুক্ষণ পরেই ক্লাসরুমের বাইরে মৃদু গুঞ্জন কানে আসতো। অবাক চোখে তাকাতাম দরজার দিকে। দেখতাম সিনিয়র আপুরা দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথমে ওঁরা স্যারকে চলে যেতে বলতেন ক্লাস থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার! চলে যাবার কথায় স্যারের মুখে হাসি ফুটতো। স্যার কি তবে চলে যাবার অপেক্ষাতেই ছিলেন! এটাই কি ছিলো মন্থর গতির কারণ! আমরা চুপচাপ বসে থাকতাম । তবে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতাম। স্যার চলে যাবার পর আপুরা মনোযোগ দিতেন আমাদের দিকে। আমাদেরকে বলতেন,
‘এটা কোন মাস ?’
নীরবতা ভঙ্গ করে আমরা বলতাম, ফেব্রুয়ারি মাস।
‘আজ কত তারিখ?’
আবার বলতাম, একুশ তারিখ।’
আপুদের মধ্যে কেউ একজন বলতেন,
‘আজ ভাষা দিবস। তাই আজ আর কোন ক্লাস হবে না!’
অন্য একজন আপু বলতেন,
‘এ দিনে ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন আমাদের ভাইয়েরা। তাই আজ ক্লাস করবে না তোমরা। আজ আমরা রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম, বরকত ——
অর্থাৎ যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের সম্মানে ক্লাস করব না। তোমরা লাইন করে চলে এসো।’
আমরা চলে আসতাম। তবে আমাদের ছোট্ট মনে এর বেশি কিছু ভাবতাম না! এর বেশি কিছু জানতামও না! আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। আর অনেক কিছু জেনেছি, বুঝেছি, হৃদয়ঙ্গম করেছি। সেই ছেলেবেলায় ক্লাসরুমে বসে আপুদের বলা গুটিকয়েক কথার প অ প্রাচীর ভেঙেছি —-
প্রবেশ করেছি বিশালতার প্রাঙ্গনে। অবাক হয়েছি এ কথা ভেবে যে দেশের জন্য কতটা ভালোবাসা থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও পিছপা হন নি ভাষা সৈনিকেরা। অবাক এখনও হই! তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধেও তো এর ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে।
আজ ভীষণভাবে অনুভব করি সেদিনের সেই নিষিদ্ধ দিনটাই
‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’
হিসেবে স্বীকৃত। গর্বে, অহংকারে আর আনন্দে ভরে ওঠে মন। বিনম্র শ্রদ্ধায় ভিজে ওঠে চোখের পাতা। মাথা উঁচু করে বলতে পারি আমরা বাঙালি! বাংলা আমাদের মাতৃভাষা —- প্রাণের ভাষা যার রয়েছে হাজার বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য!
স্মরণের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে কত কথা! আকাশকে তখন ঘোলাটে মনে হয়। বাতাসকে মনে হয় বিষণ্ণ। প্রচণ্ড ঝাঁকি দিয়ে বিষণ্ণতাকে সরিয়ে দেই। তখন উঁকি মারে আমার ফেলে আসা উষ্ণতায় ভরা দিনগুলি। মনে পড়ে সেই হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট শহরের কথা। যে শহরটাকে ঘিরে আছে
মধুমতি নদী। যে নদীর ভেজা বালিয়াড়ি ফিরিয়ে দেয় আমার শৈশব। আমি জানি সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, শুধু হারায় না! বদলেও যায়! স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা শহরটাকে আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না! স্ফীত নদীটাও হয়ে গেছে শীর্ণ। গাছ-পালার সমারোহ নেই বললেই চলে! বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির বদলে সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বিল্ডিং। তবুও আমি খুঁজি সেই ছায়াঢাকা মায়াময় শহরটাকে! সেই জোয়ারে উপচে পড়া মধুমতিকে —- খুঁজি ভেজা বালিয়াড়িকে!
ছোটবেলার সেই স্কুলটা এ শহরেই অবস্থিত! যেখানে আমি জেনেছিলাম ভাষা আন্দোলনের কথা আর ভাষা সৈনিকদের মহান বিজয়গাঁথা। এখনও মনে পড়ে আপুরা আমাদেরকে ক্লাস থেকে বের করে মাঠে বক্তৃতা দিতেন।বক্তৃতার কোন কথাই তখন বুঝতাম না। তবুও ভালো লাগতো। মনে হতো আমরাও কিছু একটা করছি ভাষার জন্য। আমরাও ভাষাসৈনিকদের একজন। কারণ ওঁদের সম্মান জানাতে আজ আমরা ক্লাস বর্জন করেছি।
বড় হয়ে যখন শিক্ষকতা করেছি তখন ছোটবেলার সেই অনুভূতিকে ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছি। মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা যে একই সুতোয় গাঁথা তা বোঝাতে সচেষ্ট হয়েছি। তখন ভাষা আন্দোলনের কথা আমরা কেবল আপুদের মুখে শুনেছি।
কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ দিন বলে বিবেচিত ছিলো বলে তা বইয়ের পাতায় স্থান পায় নি।
কিন্তু এ যুগের ছেলেমেয়েরা সে সুযোগ পাচ্ছে। দেশে বা প্রবাসে যেখানেই থাকুক না কেন, এ দিনের গুরুত্বের কথা সবাই জানে! সবাই এর মর্ম অনুভব করে।
একুশকে সামনে রেখেই তাই ঢাকা যাচ্ছি। গত বছরও তাই গিয়েছিলাম।’ তোমার হাওয়ায়
হাওয়ায়’ বইটির মোড়ক খুলেছিলাম। সে এক দারুণ অনুভূতি ছিলো সেবার। এ উপলক্ষে আমাকে একটা বক্তৃতা দিতে হয়েছিল । বক্তৃতা কেউ শুনতে চায় না। তাই ভাবলাম অল্প কিছু কথা বলব। কিন্তু আমি থামতেই শ্রোতাদের অনুরোধ এলো আরও কিছু কথা বলার। আমি মজলিসী মানুষ। কথা বলতে ভালোই লাগে। শ্রোতারা গভীর আগ্রহ নিয়ে আমার কথা শুনতে লাগলো। এ ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লেগেছিলো । মনে পড়লে এখনও ভালো লাগে।
ছোটবেলায় এ দিনে ঘুম ভাঙতো প্রভাতফেরির মিষ্টি সুর শুনে। বরুণদা আর অনীলদা অনেককে সাথে নিয়ে দেশাত্মবোধক গান গাইতেন। কী যে ভালো লাগতো! ঘুম ঘুম চোখে গান শুনতাম। একসময় মনে হতো আমিও ওদের দলে আছি। মনের মধ্যে একটা সুরের আবেশ সৃষ্টি হতো। ঘুম ভাঙলেও চোখ খুলতাম না। মনে হতো চোখ খুললেই আবেশটা হারিয়ে যাবে। মনের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করতাম অনেকক্ষণ ধরে। এখন মনে হয় এ আবেশটাই দেশপ্রেম। এখন আর প্রভাতফেরির নামটা শোনা যায় না। এ যুগের ছেলেমেয়েরা হয়তো এ শব্দটা জানেও না। তবে ওরাও দিনটিকে পালন করে অন্যভাবে। যে ভাবেই পালন করুক দিনটি তো পালিত হয় শ্রদ্ধার সাথে! এটাই বড় কথা। যুগের পরিবর্তনকে তো মেনে নিতে হবে! আমি কিন্তু এখনও শুনতে পাই বরুণদা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছেন,
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি!’
এই তো আমার প্রিয় বাংলাদেশ!
সবুজের সমারোহে ঘেরা মা অথবা মাতৃভূমি! যে নামেই ডাকি না কেন তাতেই মন ভরে যায়! আমি আবেগে আপ্লুত হই! ওই যে লেখার শুরুতেই বলেছিলাম রথীর কাছ থেকে ঢাকা গেলে পাব রূপমকে। কতটুকুই বা পার্থক্য! না, ভুল বলেছিলাম! শুধু রূপমকে না, পাব প্রিয় মাতৃভূমিকে! মন খুলে কথা বলতে পারব, হাসতে পারব, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে পারব। বৃষ্টিভেজা আকাশের দিকে তাকিয়ে রঙধনু দেখতে পারব। রাস্তার পাশে অথবা খোলামাঠে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা আর চটপটি খেতে পারব উঃ আঃ শব্দ তুলে। জানি অনেক কিছুই নেই এ দেশে। তবুও তো আমার দেশ —– আমার মা! তাকে ভুলে থাকি কী করে! প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে লেপটে আছে আমার মা!
এই সুখানুভূতি আমাকে আমার ইচ্ছের কাছে পৌঁছে দেয়। অদ্ভুত রোদ ওঠে মনের আকাশে। ‘ টুই টুই পাখিটা তখন অনবরত ডেকে যায়। মেহগিনি গাছটাকে স্পষ্ট দেখতে পাই। দেখতে পাই ঘন পাতার ওপর রোদের ঝিলিক। আর শুনতে পাই পাতার আড়ালে পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। ওহাইওর ঘোলাটে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটি একটি করে দিন গুনছি। মনে মনে বলছি আমি মার কাছে যাচ্ছি। মার গায়ের সোঁদা গন্ধ আমাকে ডাকছে! আমার আর তর সইছে না! আবার মাঠে যাব। শহিদ মিনারে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাব। অঙ্কন প্রতিযোগিতা দেখব। আর গল্প-গুজবে ভরিয়ে তুলব সময়টা।
আমি আসলে অতীতকে খুঁজে ফিরি । কেননা অতীত আমার জীবনে ভীষণভাবে বর্তমান।
বি . দ্র .ঃ আমার লেখাটা লিটন কবীর যখন ছাপবে তখন আমি ঢাকা। ওই বলেছি অতীতই আমার কাছে ভীষণভাবে বর্তমান! তাই ইচ্ছে করছে বিকেলের হিমমাখা নরম রোদে হেঁটে বেড়াতে। কিশোরীর মতো কলাপাতা রঙের শাড়ি পরে বৃষ্টিতে ভিজতে অথবা মুগ্ধতা নিয়ে কুয়াশা মোড়া আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। নয়তো ভরা নদীতে হাঁসেদের জলকেলি দেখতে। আমার আটপৌরে জীবনে এর বেশি কিছু তো আর চাই না আমি!