বাবার বুকে সেঁটে থেকে না বলতে পারা গল্পটা


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪, ১১:৩৮ অপরাহ্ণ /
বাবার বুকে সেঁটে থেকে না বলতে পারা গল্পটা

ফারহা বিনতে আজহার

আমি নিকিতা। ভালোবাসি রূপকথা, ছড়া আর ক্রিকেট। আজ স্কুলে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য আমাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। আমি পেয়েছি একটি ছড়ার বই। খুব খুশি খুশি লাগছে আমার। লিফটে ঢোকার আগে থেকেই পড়া শুরু করে দিয়েছি। দারুণ সব ছড়া! কী অদ্ভুত সুন্দর সাতরঙা সব ছবি পাতায় পাতায়।
আমরা ছয়তলায় থাকি। লিফটের মধ্যে এ সময় লিফটম্যান না থাকায় ইচ্ছে হলো চৌদ্দতলার ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসতে। আসলে লিফটে দাঁড়িয়ে উড়তে উড়তে পড়ার মজাই আলাদা। কেউ যেহেতু নেই, প্রয়োজনে দু-তিনবার একতলা-চৌদ্দতলা করব।
‘ক্রিকেট’ ছড়াটা পড়তে পড়তে লিফটে ‘১৪’ চাপলাম। লিফট উঠে যাচ্ছে ওপরে। আমি পড়তে লাগলাম ছক্কা মারার কথা। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ের কথা। একটা আনন্দের চোখ ভেজানো মিছিল কল্পনা করতে থাকলাম। তারপর একের পর এক পড়ে যেতে থাকলাম পরের ছড়াগুলো। কোনোটা কয়েকবার করে পড়লাম। বইটা পড়া শেষ হয়ে গেল একসময়। কিন্তু আমার লিফট তখনো চলছে। লিফটের ইনডিকেটর লাইট চৌদ্দতলায় নেই। এটা একটা অদ্ভুত চিহ্নের ঘরে। আমিই হয়তো অন্যমনস্কভাবে ওই সুইচটা চেপে দিয়েছিলাম ছড়া পড়তে পড়তে। শোঁ শোঁ করে চলছে লিফট। স্বচ্ছ দরজার বাইরে এক অবাক করা দৃশ্য চোখে পড়ল আমার। চারপাশে জমাট বাঁধা মেঘ। আমার ঠান্ডা লাগতে লাগল।
‘ছক্কা’ ‘ছক্কা’ চিৎকার শুনেছিলাম লিফট চলা শুরু করার সময়। শেষ বলে সাকিব আল হাসান ছক্কা হাঁকিয়ে জয় এনে দিয়েছেন বোধ হয়! ক্রিকেট বিশ্বকাপ এখন আমাদের! ছাইরঙা মেঘ ভেঙে একটা খয়েরি গোলাকার বস্তুকে উড়তে দেখলাম। মেঘের ফোকর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে একটা ক্রিকেট বল। রংধনুর মতো ওটা বেঁকে উঠে যাচ্ছে পৃথিবীর দিক থেকে। এই ছক্কাটাই কি হাঁকিয়েছেন সাকিব ভাইয়া? হতেই পারে। আমি এমন ছক্কাই ভালোবাসি তাঁর ব্যাট থেকে।
লিফটটা এবার গতি পরিবর্তন করে কিছুক্ষণ বলটার পিছু পিছু গেল। তারপর আবার শোঁ শোঁ শোঁ। ক্ষুধা লেগেছে। হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। ছয়টা বাজে। অ্যাঁ!! আমি দুই ঘণ্টা যাবৎ লিফটে? ওই তো পশ্চিম দিকে মেঘের ফাঁকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। এত উঁচু থেকে সূর্য ডোবা দেখা হয়নি কোনো দিন। প্রাণভরে লাল সূর্যের ডোবা দেখলাম। ইচ্ছে করল আরও ভালো করে দেখি। লিফটা আরও অবিশ্বাস্য গতিতে ওপরে উঠতে থাকল। অল্পক্ষণের মধ্যেই আবার ডুবে যাওয়া সূর্যটাকে দেখতে পারলাম।
সূর্যটা ক্রমেই উজ্জ্বল হতে থাকল। তারপর দুপুরের সূর্য হয়ে উঠল ওটা। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম ঘড়িতে সময় কমছে। পাঁচটা-চারটা-তিনটা। তারপর দুপুর। দুপুর বারোটায় এল ঘড়ি। এ কীভাবে সম্ভব! কীভাবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
বাবা-মায়ের কথা মনে হওয়ায় আকাশ থেকে লিফটের সুইচে চোখ গেল। ছয়তলায় নামার সুইচ টিপলাম। লিফটটা শান্ত হলো। তারপর শোঁ শোঁ করে নামতে থাকল প্রবল গতিতে। দুপুরের সূর্যটা লাল হতে হতে ডুবতে থাকল আবার। অন্ধকার হয়ে গেল আকাশ। উজ্জ্বল তারাগুলো মিটমিট করতে শুরু করল। কালচে মেঘের মধ্যে ফিরে এলাম। আবার ঠান্ডা লাগতে লাগল। আলো না থাকায় মেঘগুলো কালো দেখাচ্ছে। এগুলোর ভেতর দিয়ে আবার উড়ে যেতে দেখলাম সাকিব ভাইয়ার ছক্কা মারা বলটা। আবার শুনলাম হইচইয়ের শব্দ। বিজয় মিছিলের স্লোগান আসতে থাকল কানে। সবশেষে পট করে ষষ্ঠতলায় এসে থেমে গেল লিফট।
দরজার বাইরে বাবা-মাসহ বিল্ডিংটার আরও অনেক মানুষ জমে গেছে। মা চিৎকার করে বললেন, ‘এত সময় ধরে ছাদে আটকে রেখেছ কেন লিফট?’ একসঙ্গে হইহই করে নানা কথা বলতে লাগল সবাই। আমি হাতজোড় করে বললাম, ‘আমার কথাটা আগে শোনো!’
কেউ আমার কথা শুনতে চাইল না। নানা কড়া কড়া কথা বলতে লাগল।
‘তুমি অন্তত আমার কথাটা শোনো!’ আমি করুণ গলায় বাবাকে বললাম। আমার ক্লান্ত মুখের দিকে চেয়ে বাবা কী যেন বুঝলেন। বুকে টেনে নিলেন। সবার বকুনি শুনতে শুনতে বাবার বুকে সেঁটে যেতে থাকলাম আমি।
সত্যিই বাইরে মিছিল হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতেছে। সাকিবের হাঁকানো ছক্কার বলটা নাকি খুঁজে পাওয়া যায়নি। লিফটের বাইরে দাঁড়ানো অনেকে এসবও বলাবলি করছে। আমি আবারও কথাগুলো বলতে চাইলাম সবাইকে…।
কেন জানি মনে হলো কেউ শুনবে না। বিশ্বাস করবে না। তার চেয়ে বাবার বুকে সেঁটে থাকাই ভালো।