আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম – ধারাবাহিক ৩৪


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪, ১১:২৯ অপরাহ্ণ /
আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম – ধারাবাহিক ৩৪

মিজান রহমান নিউইয়র্ক

আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কল্যাণার্থে, এবং তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত কল্যাণার্থে, বাংলাদেশী তথা দক্ষিণ-পূর্ব- এশিয়ান ইমিগ্র্যান্ট বাবামায়েদের জন্য তাদের ‘পারিবারিক আর্থিক পরিকল্পনা’ করাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়ে আমার লেখার ধারাবাহিকতায় এটি পঞ্চম পর্ব। গত পর্বের উত্তরাধিকার- পরিকল্পনার (এস্টেট-প্ল্যানিং) ধারাবাহিকতায় এ পর্বে ইমিগ্র্যান্ট দম্পতিরা তাদের বার্ধক্যজনিত প্রয়োজনীয় কিছু আর্থিক পরিকল্পনাকে কেন এবং কিভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন অথবা আগাম পরিকল্পনা করতে অপারগ হন সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চেষ্টা করবো।
একটি মানব শিশু জন্মের পর থেকে তার মা ও বাবার এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের শারীরিক সহযোগিতার উপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠে। কারণ একটি শিশু একটা বয়সে পৌঁছার আগ পর্যন্ত নিজে নিজে হাঁটতে পারে না, খেতে পারেনা, বাথরুমে যেতে পারেনা, বিছানায় যেতে পারেনা এবং তার দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সকল কাজের জন্য তাকে অন্য কারোর সাহায্যের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। তেমনিভাবে একজন মানুষ (পুরুষ বা মহিলা) বার্ধক্য বয়সে গিয়ে একই ভাবে তার তরুণ ও যৌবন বয়সের শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে দৈনন্দিন জীবন-যাত্রার অনেক ধরনের স্বাবলম্বিতা ধীরে ধীরে হারায় এবং অন্য কেউ তাকে দেখাশোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। যে অবস্থা বার্ধক্যজনিত কারণ ছাড়াও অন্য কোনো অনাকাঙ্খিত গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার কারণে অথবা মানসিক কোনো অক্ষমতার কারণেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
মানুষ হিসেবে যে কেউই সারা জীবন আত্মসম্মানবোধ ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। বিশেষত এই আমেরিকার মত একটি স্বাতন্ত্রবোধসম্পন্ন ও স্বাবলম্বী সমাজ ব্যবস্থায় যেকোন বিবেকমান ও আত্মনির্ভরশীল ব্যক্তিই অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকতে চাননা বা চিন্তাও করেননা। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই বার্ধক্য বয়সের সম্ভাব্য অনাকাঙ্খিত অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার (কি আর্থিক ভাবে, কি শারীরিক ভাবে) আশংকাকে তাদের পারিবারিক-আর্থিক-পরিকল্পনায় এই বিষয়টিকে অনুধাবন করতে বা তাদের বিবেচনায় রাখতে অপারগ হন। বিশেষত বাংলাদেশী তথা দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার ইমিগ্র্যান্ট দম্পতি যারা নিজ নিজ দেশে একটা বৃহত্তর যৌথ-পরিবাবের পরিসরে বেড়ে উঠেছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা সেভাবেই তাদের অবস্থার কথা এখানেও একই ভাবে ধরে নিতে চান।
একটি লং টার্ম কেয়ার ইন্সুরেন্স (বীমা) আর্থিকভাবে স্বাচ্ছ্যময় ইমিগ্র্যান্ট দম্পতিদের এ ব্যাপারে আর্থিক ও মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, আমেরিকার কোন স্টেটে তারা বসবাস করেন সেই প্রেক্ষিতে তাদের পারিবারিক সম্পদ রক্ষার্থেও কাজে দিতে পারে। লং টার্ম কেয়ার ইন্সুরেন্স (দীর্ঘমেয়াদী যত্ন বীমা) একটা দীর্ঘ-মেয়াদী সময়ের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরিষেবা এবং ব্যক্তিগত সেবা মেটাতে সহায়তা করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদী সেবার ক্ষেত্রে (লং টার্ম কেয়ার) প্রযোজ্য পরিষেবার মধ্যে ৬টি ‘ডেলি লিভিং একটিভিটিসে’র যেকোনো একটি বা একাধিক ব্যক্তিগত দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপে অদক্ষতা বা অক্ষমতাকে বোঝায়-(১) নিজে নিজে স্নান বা গোসল করতে না পারা; (২) ড্রেসিং বা কাপড়-চোপড় পরতে না পারা; (৩) টয়লেট ব্যবহার করতে না পারা; (৪) নিজে নিজে চলাফেরা করতে না পারা (যেমন বিছানায় যাওয়া বা বিছানা থেকে নামা বা একটা চেয়ারে বসতে পারা বা বসা থেকে ওঠা);
(৫)ইনকনসিস্টেন্স বা অসামঞ্জস্য হওয়া (যেমন প্রস্রাব বা মলত্যাগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অভাব); এবং (৬) নিজে নিজে খেতে না পারা বা জল পান করতে না পারা অথবা সময়মত ওষুধ সেবনে অপারগতা।
সাধারণত ইমিগ্র্যান্ট দম্পতিরা যে ৪টি কারণ বা অজুহাত দেখিয়ে তাদের বার্ধক্য বয়সের জন্য ‘লং টার্ম কেয়ার প্ল্যানিং” করতে অপারগতা দেখান তা হলো (১) আমরা হয়তো অল্প বয়সেই মারা যাবো, সুতরাং এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন কারণ নাই; (২) আমার স্বামী/স্ত্রী আমার দেখভাল করবেন; (৩) প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা/নাতি-নাতনিরা আমাদের দেখাশোনা করবে, যেমন আমরা আমাদের বাবা-মায়ের/দাদা-দাদির জন্য করেছিলাম; (৪) সেই পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের নিজের দেশে ফিরে যাবো, সেখানে আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের দেখাশোনা করবে। এই অজুহাতগুলো যে কতটা যুক্তিহীন তা যে কোন বিবেকমান বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই অনুধাবন করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে আমেরিকায় যারা ৬৫ বছর বয়সে পা দিচ্ছেন (ইমিগ্র্যান্ট অথবা নন-ইমিগ্র্যান্ট নির্বিশেষে) তাদের মধ্যে ৫২% জনসংখ্যার বাকি জীবনকালীন সময়ে কোনো না কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সেবার (লং টার্ম কেয়ার) পরিষেবার প্রয়োজন হতে পারে। ৬৫ বছর বয়স ও তার উর্ধের জনসংখ্যার ৩৩% তাদের জীবনের বাকি সময়কালে নার্সিং হোম কেয়ারের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে নার্সিং হোমে যারা জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন তাদের মধ্যে ৭০% হলো নারী। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে বয়স ৬৫-৭৪ জনসংখার ৮% এবং বয়স ৭৫-৮৪ জনসংখ্যার ১৭% যাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিষেবার (লং টার্ম কেয়ার) প্রয়োজন পড়েছে।
ইমিগ্র্যান্ট দম্পতিদের এটা বুঝতে হবে যে তাদের ঘরে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা তাদের নিজেদের জীবন-যাপনে, পেশাগত কাজে ও তাদের ভবিষ্যৎ পরিবার এবং ছেলে- মেয়েদের (ইমিগ্র্যান্ট দম্পতির নাতি-নাতনিদের) নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সুতরাং তারা (ছেলেমেয়েরা) চাইলেও সারাক্ষণ বাবা-মাকে দেখভাল করা সম্ভব হবে না। তদুপরি তাদের (নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের) এদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে অনেকটা স্বাবলম্বী ও স্বতন্ত্রতায় বিশ্বাসী, তারা সেই মনোভাব নিয়েই বেড়ে ওঠে। সুতরাং তারা এটা বুঝবে না যে তাদেরকে কেন তাদের ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মাকে বার্ধক্য বয়সে পরিচর্যা অথবা তদারকি করতে হবে। বরঞ্চ তারা সহজেই ধরে নেবে যে তাদের বাবা-মা নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আর্থিক-পরিকল্পনা করে রেখেছেন।
আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা একে অপরকে যতই ভালোবাসেন না কেন, বা একজন আরেকজনের যত্ন নিতে চান না কেন, তাদের বুঝতে হবে যে তারা দুজনেই যখন বার্ধক্যে পৌঁছাবেন এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা শারীরিক সক্ষমতা হারাবেন আরেকজনকে প্রতিদিন ও নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক ভাবে দেখভাল করার।
পরিশেষে বলতে চাই যে একটা যথাযথ উত্তরাধিকার- পরিকল্পনার (এস্টেট-প্ল্যানিং) জন্য আপনাকে অবশ্যই এ ব্যাপারে একজন এল্ডার কেয়ার এটর্নি বা এস্টেট প্ল্যানিং এটর্নির পরামর্শ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি আপনার পরিবারে এক বা একাধিক ‘বিশেষ-স্বাস্থ্যসেবা-প্রয়োজন’ (চিলড্রেন উইথ স্পেশাল নীডস) এমন ছেলেমেয়ে থাকে তাহলে সেই ক্ষেত্রে আপনার এস্টেট- প্ল্যানিং ডকুমেন্টসের মধ্যে ‘স্পেশাল নীডস ট্রাস্টে’র অন্তর্ভুক্তি
রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এ ব্যাপারে আপনাকে হয়ত একজন স্পেশাল-নীডস-এটর্নির পরামর্শও নিতে হতে পারে। সূত্রঃ সাপ্তাহিক বাঙালী, নিউইয়র্ক, মে ১, ২০২১