আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম – মিজান রহমান নিউইয়র্ক


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১২, ২০২৪, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ /
আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম – মিজান রহমান নিউইয়র্ক

ধারাবাহিক-৩৩
বাংলাদেশী তথা দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার ইমিগ্র্যান্ট পরিবারের জন্য তাদের ‘পারিবারিক আর্থিক পরিকল্পনা’ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়ে আমার লেখার ধারাবাহিকতার এটি চতুর্থ পর্ব। এই পর্বে আমেরিকার পারিবারিক আইনগত অধিকার ও ভবিষ্যৎ উত্তরসূরিদের জন্য রেখে যাওয়া ধন-সম্পদের ব্যাপারে ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েদের উপর কি ধরনের দায়- দায়িত্ব বর্তায় সেই সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।
যেহেতু ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েদের নিজেদের কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা নেই (বা হয়না) যে এদেশে কারো পিতামাতা মারা গেলে উত্তরসূরি হিসেবে ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের কি ধরনের আইনগত পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয় এবং ট্যাক্স-সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব নিতে হয়। বাবা-মায়েরা তাদের পারিবারিক-উত্তরাধিকার পরিকল্পনার তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না। এমনকি অনেক শিক্ষিত, বিত্তশালী এবং আর্থিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন এমন ইমিগ্র্যান্ট পরিবারও এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ায় গড়িমসি করেন বা বিলম্বিত করেন। এমন কি বিষয়টি বাদ দিয়ে রাখতে চান। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন যে তাদের হয়তো উত্তরাধিকার-পরিকল্পনা (এস্টেট-প্ল্যানিং) করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ বা সম্পদ নেই বা তারা বিশ্বাস করেন যে তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানদের জন্য সবকিছু ঠিকঠাকই থাকবে ।
আমেরিকাকে একটি স্বপ্নের দেশ হিসেবে বিবেচনা করেই হাজারো নতুন ইমিগ্র্যান্ট প্রতিবছর এদেশে আসেন এবং বসত গড়েন। তারা তাদের সন্তান-সন্ততির জন্ম দেন, তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলেন। ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে তারা যার যার যোগ্যতা, মেধা ও আকাঙ্খা অনুযায়ী নিজেদেরকে পেশাগতভাবে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত করার প্রয়াস পান। তারা অর্থনৈতিক সাফল্যও অর্জন করেন। তারা অনেক সময় হয়তো ভুলে যান যে আমেরিকায় কঠোর পরিশ্রম করে অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা ও উচ্চতর জীবন যাপন সম্ভব, তবে যে কোন একটা অযাচিত বিপর্যয় যে সেই সুখ-আহলাদের জীবনকে একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে পারে তা তারা অনেক সময় তাদের বিবেচনায় রাখতে ব্যর্থ হন। আমেরিকা আইনগত অধিকার ও সমতার দেশ এবং আইনের প্রয়োগ এদেশে অত্যন্ত প্রখর ও সরাসরি এবং এতে কোন রকমের ফাঁক-ফোকর নেই । তবে কিছু কিছু আইনগত অধিকারের সুবিধা পাবার জন্য এবং পরিবারের আপনজনদের জন্য তা নিশ্চিত করার জন্য, অনেক ক্ষেত্রে আগাম কিছু পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। পারিবারিক উত্তরাধিকার-পরিকল্পনা (এস্টেট-প্ল্যানিং) তার মধ্যে অন্যতম। ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েরা যদি যথাযথভাবে তার সমাধান না করে রাখেন, তাদের আকস্মিক মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতায় তারা পরিবারকে অনেক ধরনের আইনগত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখতে পারেন অথবা অনাকাঙ্খিত বা অপ্রয়োজনীয় আইনগত ঝামেলায় তাদের রেখে যেতে পারেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই একটা প্রাথমিক পর্যায়ের এস্টেট-প্ল্যানিং, যেমন একটা উইল বা ট্রাস্ট (a will or trust) সহজেই তার সমাধান দিতে পারে। আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে ইমিগ্র্যান্ট তথা সব পরিবাবের জন্যই প্রাথমিক পর্যায়ের একটা এস্টেট-প্ল্যানিং-এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
যথাযথ একটি উত্তরাধিকার-পরিকল্পনার (এস্টেট-প্ল্যানিং) জন্য ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েদের তাদের আর্থিক-পরামর্শদাতার (ফাইনান্সিয়াল – এডভাইজরের) সাথে কাজ করার সাথে সাথে অবশ্যই তাদেরকে একজন পেশাজীবী এস্টেট-প্ল্যানিং এটর্নির পরামর্শও নিতে হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ এস্টেট-প্ল্যানিং-এর মধ্যে যে ৬টি বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি থাকা উচিত তা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। (১) উইল/ট্রাস্ট; (২) ডিউরেবল পাওয়ার অব এটর্নি; (৩) স্বাস্থ্যসেবা বা হেলথকেয়ার প্রক্সি; ( ৪ ) উত্তরাধিকারী শনাক্তকরণ (বেনিফিশিয়ারি ডেজিগনেশন); (৫) অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের জন্য অভিভাবকত্ব নিয়োগ (গার্ডিয়ানশীপ ডেজিগনেশন); (৬) লেটার অব ইন্টেন্ড । যদি কোনো পরিবারে এক বা একাধিক ‘বিশেষ-স্বাস্থ্যসেবা-প্রয়োজন’ (চিলড্রেন উইথ স্পেশাল নীডস) এমন ছেলেমেয়ে থাকে তাহলে সেই পরিবারকে তাদের এস্টেট –
প্ল্যানিং ডকুমেন্টের মধ্যে ‘স্পেশাল নীডস ট্রাস্ট’-এর অন্তর্ভুক্ত রাখার প্রয়োজন হতে পারে। যাতে করে সেই বাচ্চারা যেন তাদের বাবা-মায়ের অবর্তমানে ফেডারেল গভর্নমেন্ট প্রদত্ত বা স্থানীয় সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়। এ ব্যাপারে তাদেরকে অবশ্যই একজন স্পেশাল-নীডস-এটর্নির পরামর্শ নিতে হতে পারে।
আবার কোনো ইমিগ্র্যান্ট দম্পতি যদি তাদের মধ্যে একজন বা দুজনেই আমেরিকার নাগরিক (সিটিজেন) না হয়ে থাকেন বা ইচ্ছা করে না নিয়ে থাকেন, অথবা তাদের যদি অন্য কোনো দেশে (আউটসাইড অব ইউএসএ) বিশাল আকারের কোন সম্পদ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক থেকে থাকে এবং তারা যদি তা তাদের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারদের (যেমন, তাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বা নাতি-নাতনিদের জন্য রেখে যেতে চান, সেক্ষেত্রে তাদেরকে হয়তো আরো কিছুটা অ্যাডভান্স লেভেলের এস্টেট-প্ল্যানিং করতে হতে পারে। এ ব্যাপারে তাদেরকে হয়তো এমন একজন এস্টেট-প্ল্যানিং-এটর্নির সাথে কাজ করতে হবে যে কিনা ফরেন-অ্যাসেট সেটেলমেন্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞ (স্পেশালাইজড)।
আমেরিকার পারিবারিক আইনকানুন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চেয়ে কঠোর এবং জটিল ধরনের ট্যাক্স-কাঠামোতে ভরা। এটি একটি মামলা-প্রবণ সমাজও বটে (ল’স্যুট-প্রোণ সোসাইটি)। অনেক সম্পদশালী বা ধনী ইমিগ্রান্ট পরিবার সঠিক ও আগাম পরিকল্পনার অভাবে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঐশ্বর্যশালী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক-উত্তরাধিকার স্থানান্তরের পরিবর্তে হয়তো তাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ও নাতি-নাতনিদের জন্য একটা আর্থিক বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা ও পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের বীজ রেখে যেতে পারেন এবং তা হবে পারে শুধুমাত্র তাদের পারিবারিক উত্তরাধিকার-পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাহ্য করার কারণে।
ফজলুর রহমান খান, (১৯২৯-১৯৮২), যিনি এফ.আর. খান নামেই অধিক পরিচিত। তিনি একজন প্রসিদ্ধ বাংলাদেশী-আমেরিকান আর্কিটেক্ট ছিলেন । যিনি সিয়ার্স টাওয়ারের স্থাপত্য-ডিজাইনারদের মধ্যে অন্যতম । ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত যা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার-ভবন বলে খ্যাত ছিল। ১০৮ তলা উচ্চতার শিকাগো শহরের একটি প্রধান আকর্ষণ এবং আজো প্রতিদিন শত শত পর্যটক সেই ভবন পরিদর্শনে যান । এখন অবশ্য এই ভবন জন হ্যানকক সেন্টার নামে পরিচিত। সেই বিখ্যাত আর্কিটেক্ট, ড. ফজলুর রহমান খান, যিনি শখ করে তার নিজের থাকার বাড়িটিরও ডিজাইন করেছিলেন এবং পরিবারের জন্য সংরক্ষণের ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ৯ মাসের মধ্যেই তার উত্তরসূরিদের সেই বাড়িটা তড়িঘড়ি করে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, শুধুমাত্র তার উত্তরসূরির জন্য পরিকল্পিত লেগাল ডকুমেন্টগুলোতে (উইল/ট্রাস্ট) সই (স্বাক্ষর) না থাকার কারণে ।
উপসংহারে আমি বলতে চাই যে আর্থিকভাবে সফল ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েদের এবং তাদের পরিবারগুলির অভাবনীয় অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে এদেশে। এটিকে নিছক ভাবে শুধুমাত্র একটা সাচ্ছন্দ জীবনযাপন করা বা তাদের ঘরে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হিসাবে গণ্য করা উচিত নয়। তাদের অনেকেরই উচ্চতর উপার্জনক্ষম হবার সুবাদে পারিবারিক সাচ্ছন্দের বাইরে আরো অনেক মূল্যবান পারিবারিক উত্তরাধিকার (ফ্যামিলি লিগেসি) রেখে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেমন তাদের সাফল্য তাদের একটি উপযুক্ত-কারণের দাতব্য (charitable) উপহার হিসাবে একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার তৈরি করতে বা অমরত্ব সুরক্ষিত করার সুযোগ দিতে পারে। সঠিক ও সময় মত একটি উত্তরাধিকার- পরিকল্পনা তাদের উত্তরসুরিদের অনেক ধরনের ট্যাক্স-বেনিফিটও দিতে পারে এবং সম্পদ রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক ধরনের ট্যাক্স- সেভিংসের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে আমাদের বৃহত্তর কমিউনিটিতে অনেক ধনবান ইমিগ্র্যান্ট মারা যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তারা তাদের সম্পদের বিরাট অংশ অযথা ট্যাক্স-বার্ডেন হিসেবে রেখে যাচ্ছেন। যার অনেকটাই তারা যেমন তাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের জন্য সহজভাবে রেখে যেতে পারতেন। একই সাথে বৃহত্তর-কমিউনিটি বা সমাজের উপকারে, এমনকি নিজ নিজ জন্মভূমির গরিব মানুষের কল্যাণার্থে, বড় অংকের তহবিল রেখে যেতে পারতেন।
সূত্র: সাপ্তাহিক বাঙালী, নিউইয়র্ক, এপ্রিল ২৪, ২০২১