নারীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষায় চড়াই-উতরাই


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১২, ২০২৪, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ /
নারীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষায় চড়াই-উতরাই

ওহাইও সংবাদ: দুই দশক আগেও এমন সময় ছিল যখন নারীরা কোনোমতে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তারপর একদল নারী সংসার সমীকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। আরেক দল করপোরেট বা চাকরিতে ঢুকলেও সংসার বৃত্তে ঘুরপাক খেত। এখন সময় বদলের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
নারীরা একাকী নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। উচ্চশিক্ষা কিংবা চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারী নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করছেন। নারীর বিদেশে উচ্চশিক্ষা আর ক্যারিয়ার ভাবনা নিয়ে লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুন তাজরীন।
বড় আকারের পরিকল্পনা করতে হবে: আমাদের দেশের বাস্তবতায় নারীরা নিজের মতো পরিকল্পনা করতে চায় না।
অন্যের দেখানো পথেই এগোতে চায়। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি তখনই উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। আমি তখন থেকেই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগ খুঁজতে থাকি। আমি দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে মাস্টার্স চলাকালীন নিজেকে তৈরির জন্য ইন্টার্নশিপসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হই।
এতে আমাদের পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। আমি কী পারি, কী করতে হবে, কিভাবে নিজেকে সামনে নিয়ে যেতে পারি তা বুঝতে পারি। আমি নিজের জন্য পাঁচ বছর করে করে বড় পরিকল্পনা করে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
পরিবারের সমর্থন ও মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ: আমাদের দেশের নারীরা সত্যিকার অর্থে পরিবারের সমর্থন পেলে অনেক কিছু করতে পারে। আমার বাবা-মা সব সময় আমাকে সহায়তা করছেন।
স্বজনদের অনেক প্রশ্ন থাকলেও বাবা-মা আমার ওপর ভরসা রাখেন। তাদের ভরসার কারণে আমি একা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে পড়তে এসেছি। আমি দেশে থাকলে কখনোই নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে কাজ করিনি। আমার পরিবারের সহায়তায় আমি আজ ঢাকা, কাল কক্সবাজারের ৩৩টি রিফুজি ক্যাম্পের শিশু সুরক্ষা টিমে উখিয়া কিংবা বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাঁচটি উপজেলায় কাজ করেছি। আমাদের দেশ উন্নত হচ্ছে, আমাদের পরিবারগুলোরও মানসিকতায় উন্নত হতে হবে। অনেক কিশোরী আছে যারা পরিবারের সহায়তা পেলে নিজ লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে।
নিজের জন্য ভাবতে হবে: এখনো আমাদের নারীরা লোকে কী ভাববে তা নিয়ে আটকে থাকে। আমি এই সময়ের নারীদের দেখে অনুপ্রাণিত। সামাজিক নানা সংকটকে তারা পাশে রেখেই নিজের মতো করে কাজ করছে। আমি উন্নয়ন সংস্থায় কাজের সময় দেখেছি, গ্রামীণ নারীরা নিজের হাতে সংসার সামলাচ্ছেন। নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। শহরের শিক্ষিত নারীরা চাকরির পাশাপাশি নিজের মতো করে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন।
নিজের পরিকল্পনা বুঝে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে: আমি সব সময় ইন্টার্নশিপসহ নানা কাজে যুক্ত থেকে শিখেছি। প্রযুক্তির কারণে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। সেসব চ্যালেঞ্জ জয় করতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। আমি বলব, যারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তারা নিজের আগ্রহ থেকে কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে পড়ুন। নিজের মতো করে আগ্রহ এমনি তৈরি হয়ে যাবে। যারা এখন পেশাজীবী তাদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা কাজে লাগাতে হবে: আমরা কী করব, কিভাবে করব, তা অনেক সময় বুঝতে পারি না। আমাদের কী করা উচিত তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুল-কলেজের পড়াশোনায় শেখানো হয় কম। আমি বলব, সময়কে কাজে লাগাতে হবে। পড়ার সময় পড়া, আর বাকিটা সময় নিজেকে তৈরি করতে হবে। নিজেকে তৈরি মানে নিজের আগ্রহ থেকে সৃজনশীল কোনো কাজে যুক্ত হতে পারেন। ঘুরতে যেতে পারেন। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে নিজের জানার দুনিয়া বাড়াতে পারেন। যেতে না পারলে এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নতুন কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চার বছর যত বেশি সুযোগ তৈরি করা যায়, যত অভিজ্ঞতা নেওয়া যায় ততই দারুণ কিন্তু।
নেটওয়ার্কিং করতে হবে: এখন আগের পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। আগে হয়তো পরিবার বা এলাকার পরিচিত মানুষেরাই ছিল আমাদের ভরসা। এখন নেটওয়ার্কিংয়ের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন মানুষের সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিজেকে দক্ষ ও শক্তিশালী কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করুন। অনেক সময় নেটওয়ার্কিং স্কিলের কারণে আমাদের বড় বড় কাজের সুযোগ তৈরি হয়। উচ্চশিক্ষায় যারা বিদেশে আসতে চান, তাদের নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে অনেক কিছু জানার সুযোগ আছে।
মন ও শরীরের যত্ন নিতে হবে: শুধু সাফল্যের পেছনে ছুটলে চলবে না। নিজের মনের যত্ন নিতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য প্রতিদিনের অভ্যাসকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের নারীরা অন্যের যত্ন নিতে নিতে শেষ হয়ে যায়, এই অভ্যাস থেকে সরে আসতে হবে। নিজের যত্ন নিতে হবে। নিজে ভালো না থাকলে পরিবারের যত্ন নেবেন কিভাবে? নিজে ভালো না থাকলে কাজের মানও কিন্তু ভালো থাকবে না। স্বাস্থ্য একধরনের বিনিয়োগ, এ বিষয়টি মাথায় রাখুন।

একা মানে সব থেকে দূরে সরে থাকা না: জীবনে নারী কিংবা পুরুষ যে লিঙ্গের হোন না কেন, প্রকৃতি সবার জন্য সমান। সামাজিকভাবে আপনি বৈষম্যের শিকার হলেও আপনাকে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হবে। একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকা যাবে না। সূত্র: কালের কন্ঠ