আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম-মিজান রহমান নিউইয়র্ক


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৪, ২০২৩, ১০:৩৪ অপরাহ্ণ /
আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্ম-মিজান রহমান নিউইয়র্ক

ধারাবাহিক- ৩২

নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতে কলেজে পড়ার খরচের জন্য সঞ্চয় করাটা সাম্প্রতিক ইমিগ্র্যান্ট পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। একটি কলেজ সঞ্চয়-পরিকল্পনা তৈরি করা অনেকটা নির্ভর করে সেই ছেলেমেয়েদের শিক্ষাগত উদ্দেশ্য (উচ্চাকাঙ্খা) এবং তারা সম্ভাব্য কোন ধরনের কলেজে যেতে পারে তার ওপর। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর থেকে আপনাকে আপনার সন্তানের জন্য একটা কলেজ-সেভিংস ফান্ড শুরু করতে সহায়তা করতে পারে: (১) আপনি আপনার সন্তানের জন্য প্রাইভেট কলেজ নাকি পাবলিক কলেজ পছন্দ করবেন বা অগ্রাধিকার দেবেন? (২) এতে কি পরিমাণ অর্থ খরচ হবে? খুব বেশি কত হতে পারে? তা নিশ্চিত হতে হবে এবং কলেজের মূল্যস্ফীতির হারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। (৩) এই অর্থ সঞ্চয় করতে আপনার কত সময় লাগবে, বা আপনার কত সময় হাতে আছে (আপনার সন্তানের বর্তমান বয়স অনুযায়ী)?
কলেজের ব্যয়ভার সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হারের তুলনায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পায়। গড়ে প্রতি বছর ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ হারে তা বৃদ্ধি পায়। এদেশের স্বাস্থ্য-সেবা খাতের পর কলেজে ব্যয়ভার সবচেয়ে বেশি। সুতরাং আদর্শিকভাবে একটা শিশুর জন্মের পরপরই তার জন্য কলেজ ফান্ড তৈরির নিমিত্তে একটা সঞ্চয় শুরু করা উচিত। তাতে করে বাবা-মায়েরা সর্বোচ্চ ১৮ বছর সময় পাবেন সেই শিশুর কলেজে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থ সঞ্চয়ের। কিন্তু অধিকাংশ বাংলাদেশী ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইমিগ্র্যান্ট পরিবার এই বিষয়ে গড়িমসি করে। তারা বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য কোন কলেজ ফান্ড পরিকল্পনার দরকার নেই, তারা নিজেরাই তার বন্দোবস্ত করবে। যখন কোনো সন্তান তার কলেজের বয়সে পৌঁছে যায় এবং পিতামাতারা তাদের বাধ্য করেন যেন তারা সেই অল্প বয়সেই নিজের উপার্জনের স্বার্থে কলেজে পড়াশোনা করবে। তার মানে, পিতামাতারা মূলত তাদের সন্তানের জন্য নিজেদেরকে অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন থেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে সন্তানের নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলার আশংকা থাকে। কিছু কিছু ইমিগ্র্যান্ট বাবামা মনে করেন, তারা তাদের ছেলেমেয়ের জন্য ভবিষ্যতে কলেজে পড়াশোনার অর্থ সঞ্চয়ের কোন পরিকল্পনা করবেন না। কারণ অতীতে তারা নিজেরাই তাদের নিজেদের পড়াশোনার খরচ যোগাড় করেছেন টিউশনি করে বা অন্য কাজ করে। তাদেরকে এ ব্যাপারে কেউ সাহায্য সহযোগিতা করেনি। সুতরাং তারা কেন তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য তা করতে যাবেন? এটা হয়তো সত্যি যে অনেক ইমিগ্র্যান্ট তাদের জীবনে অনেক ধরনের সংগ্রাম করেছেন, যারপরনাই কষ্ট করে এদেশে এসে বসত গড়েছেন এবং এদেশে নিজেদের জীবিকার সংস্থান করেছেন। তারা মনে করেন, তাদের সন্তানদেরও তাদের পথ অনুসরণ করা উচিত। বাস্তব জীবনের কঠোরতা মোকাবেলা করতে শেখা উচিত এবং নিজেদের কলেজের ব্যয়ভার নিজেদেরই বহন করা উচিত। তবে তারা প্রায়শই ভুলে যান যে, তারা নিজ নিজ দেশে যেভাবে নিজেদের শৈশব কাটিয়েছেন সেই তুলনায় তারা এদেশে তাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনেক বেশি আদর-যত্ন ও আরাম-আয়েস দিয়ে বড় করে তুলছেন।
ইমিগ্র্যান্ট বাবামায়েদের এটাও ভুলে গেলে চলবেনা যে, এখন পর্যন্ত তাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে স্বাচ্ছন্দ্যময়। জীবন উপভোগ করছে তাহলো তাদের (ইমিগ্র্যান্ট পিতামাতার) উপার্জনের যোগ্যতা এবং তাদেরই পছন্দসই জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী। যা কিনা তারা (ছেলেমেয়েরা) কখনো দাবি করেনি, বরঞ্চ তারা তাদের বাবামায়ের পছন্দের উপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু সাচ্ছন্দ্য উপভোগ করে বেঁচে থাকায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ছেলেমেয়েরা সিদ্ধান্ত নেয়নি এদেশে আসার, বরঞ্চ তাদের ইমিগ্র্যান্ট বাবামায়েরাই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একজন সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তি কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে হয়তো এই আমেরিকাতেও সাফল্য অর্জন করতে পারে। তবে একটি ভাল কলেজ-শিক্ষা যে কাউকে এই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার পথকে সহজতর করতে পারে। সেই কারণেই একজন যত্নবান পিতা-মাতার অবশ্যই উচ্চ শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েদের উদ্যোগের সাথে নিজেদের জড়িত হওয়াটা তাদের বিবেচনায় রাখা উচিত।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ইমিগ্র্যান্ট পরিবারগুলো তাদের জাতীয়তার উৎস নির্বিশেষে তাদের নিজস্ব পারিবারিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে ধরে রাখতে চায়। তারা আশী করেন, তারা তাদের পারিবারিক মূল্যবোধগুলো যেমন তাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানের কাছে স্থানান্তরিত করবেন, তেমনি তাদের নাতি-নাতনি ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও হস্তান্তরের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। আমেরিকার খোলামেলা সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির চেয়ে ভিন্নতর, যার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ইমিগ্র্যান্ট পরিবারগুলো প্রায়ই হিমশিম খায় এবং তা তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রতিফলন ঘটুক তা মোটেই চায় না। উদাহরণস্বরূপ, এদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যেমন উন্মুক্ত প্রাক-বিবাহ যৌনতার সম্পর্ককে যতটা স্বাভাবিকভাবে নেয়া হয়, তাদের আরো কিছু বদভ্যাস যেমন, মাদকাসক্তি, ধূমপান, মদ্যপান এবং অন্যান্য অভ্যাসগুলি যা কিনা সাম্প্রতিক ইমিগ্র্যান্ট বাবামারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের সন্তানদের জড়িত হওয়া দেখতে চাননা।
যখন কোনো সন্তান কলেজের বয়সে পৌঁছে যায় এবং পিতামাতা জোর দিয়ে বলেন যে তাদের তরুণ বা যুবক-যুবতী ছেলেমেয়েরা কলেজে পড়ার জন্য নিজেরাই উপার্জন করুক, পিতামাতারা মূলত সন্তানের জন্য দায়বদ্ধ হওয়া বন্ধ করে দেন এবং তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ বা শাসন করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এ জাতীয় পরিস্থিতিতে সন্তানরা তাদের পড়াশোনা সম্পাদনের জন্য পারিবারিক মূল্যবোধগুলির সাথে দ্বন্দ্ব ঘটতে পারে এমন পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি কলেজে পড়ার উদ্দেশ্য স্থগিত বা বিলম্বিত করা বা সম্পূর্ণ পরিত্যক্তও করার প্রয়াস পেতে পারে। ছেলেমেয়েরা তাদের পিতামাতার প্রত্যাশার বিপরীতে আচরণ করার বা জীবনযাত্রা পরিচালনার জন্য একটি পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে তাদের জন্য শিক্ষার তহবিলের (প্ল্যানিং ফর এ কলেজ ফান্ডিং) জন্য প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে, বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের পেশা-পছন্দে এবং তাদের প্রত্যাশিত জীবনযাত্রার ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ ও শুভাকাঙ্খী হিসেবে তদারকি করতে পারেন।
সুতরাং ইমিগ্র্যান্ট পরিবারের বাবামায়ের তাদের সাধ্যমত সন্তানদের কলেজ-ফান্ডিং করাটা (অর্থ সঞ্চয়) অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
পরিশেষে বলতে চাই, যদি কলেজের জন্য সঞ্চয় করাটা আপনার পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লক্ষ্য হয়ে থাকে, এবং কিভাবে আপনি নিজের, আপনার সন্তানদের, বা নাতি-নাতনি বা আপনার নিকটবর্তী অন্যান্য ছেলেমেয়েদের জন্য কলেজের জন্য সঞ্চয়-পরিকল্পনা শুরু করতে পারেন সে সম্পর্কে আপনি একজন আর্থিক পরামর্শদাতার (ফাইনান্সিয়াল এডভাইজরের) সাথে কথা বলতে পারেন। কিছু কিছু কলেজ-সেভিংসের ট্যাক্স সুবিধাও পেতে পারেন যে ব্যাপারে আপনি আপনার ট্যাক্স-এডভাইজরের (সিপিএ বা একজন একাউন্টেন্টের) পরামর্শও নিতে পারেন। সূত্র: সাপ্তাহিক বাঙালী, নিউইয়র্ক, এপ্রিল ১৭, ২০২১