এক চিলতে নস্ট্যালজিয়া-রাশিদা কামাল


ওহাইও সংবাদ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৪, ২০২৩, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ /
এক চিলতে নস্ট্যালজিয়া-রাশিদা কামাল

( শেষ পর্ব )

(আগের কথা—–দেখা হলো লিপিকার সাথে। দেখা হতেই ও জড়িয়ে ধরলো আমাকে। একইভাবে আমিও ওকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম।)
আমরা সামনের দিকে একটু এগোলাম। উল্লেখ্য আমরা বলতে আমি বোঝাচ্ছি আমার বেয়ান জাকিয়া সুলতানার কথা। আমাদেরকে সাধারণত এক সাথেই দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয় আমি যখন প্রথম মার্কিন মুলুকে আসি তখন নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হতো। আমার আলোকিত ঝলমলে জীবনটা হঠাৎ করেই পাল্টে গেলো। আস্তে আস্তে নি:সঙ্গতার কালো ছায়া আমাকে গ্রাস করতে লাগলো। ভোর হতেই যে যার কাজে চলে যেতো। আমি একা বাসায় পড়ে থাকতাম জগদ্দল পাথরের মতো। একাকীত্বের কালো ছায়া ক্রমেই ঘনতর হতে লাগলো। এক সময় অনুভব করলাম একাকীত্ব আমাকে ভীষণভাবে ঘিরে ধরে আমাকে নিয়ে গেছে মন খারাপের দেশে।
আমি তখন কিছুটা গুরুত্বহীনও হয়ে পড়লাম। আর তাই কাউকে কাছে পাবার জন্য ব্যাকুল হতাম। কিন্তু কে থাকবে পাশে! এ দেশে সবাই ব্যস্ত! আমার মতো অলস সময় কারোরই নেই! এক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। না, এ দেশে থাকব না! এ দেশ আমার মতো মানুষের জন্য না! কী আছে এখানে! কে আছে এখানে! আর কেনই বা এতদিন এখানে পড়ে আছি ভাসমান শ্যাওলার মতন! কোন আকর্ষণে ঝলমলে
কর্মময় জীবনের ইতি টানতে চলেছি! তখন মনের কোনে জমে থাকা কালো মেঘটার দিকে তাকাতাম। জল ঝরাতে চাইতাম সেখান থেকে! মনকে জলকণায় ভেজাতে চাইতাম—–
শীতল করতে চাইতাম। অনেক কষ্টে নিজেকে বোঝাতাম। বোঝাতে গিয়ে একটা আকর্ষণের কথা মনে হতো। সেই আকর্ষণই আমার বেয়ান জাকিয়া সুলতানা! সবাই কাজে বেরিয়ে যাবার পর আমার মনে হতো আমারও একটা যাবার জায়গা আছে! আছে অলস প্রহর মুখরতায় ভরিয়ে তোলার সুযোগ! জগদ্দল পাথর না হয়ে আমিও তো যেতে পারি বেয়ানের কাছে! আমার শূন্য হাতটা বাড়াতে পারি ওঁর দিকে!
বাড়িয়েও ছিলাম। তবে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে। কারণ বেয়ানেরও তো সংসারের কাজ আছে। মাঝে মাঝে তাই ইচ্ছেটা ডুবে যেতো! কিন্তু এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এক সময় ঝেড়ে ফেললাম। কারণে অকারণে বেয়াইনের কাছে বেয়ানের কাছে যেতাম, বসে থাকতাম, গল্প করতাম! সে সময়টা ছিলো আমার প্রবাস জীবনের মহামূল্যবান প্রাপ্তি! গল্পের ফাঁকে ফাঁকে বেয়ান আমাকে কতকিছু খেতে দিতেন! আমার তখন চোখ ভিজে উঠতো। আমি বেয়ানকে বুঝতে দিতাম না। আদরটাকে গ্রহণ করতাম এক মুঠো রোদের মতো। মন খারাপের গণ্ডি থেকে বের হতে পারতাম। ফেলে আসা দিনগুলির কথা ভুলতে পারতাম তখন! এক সময় মনে হতো আমি কোন পথহারা নাবিক না!
আমার একটা দ্বীপ আছে—-
সমুদ্রের মাঝে জেগে ওঠা সবুজ শ্যামলে ঢাকা শান্তিময় একটা দ্বীপ! আমার সূক্ষ্ম অনুভূতি কেবলই সেই দ্বীপটা খুঁজতো! এখনও খোঁজে! আমার জীবন থেকে সে দ্বীপটা এখনও হারিয়ে যায় নি! অর্থাৎ আমাদের সম্পর্কটা সেই আগের মতোই আছে! আমি বুঝতে পারি আমার জীবনটা প্রবাসে এসে বর্ণহীন, গন্ধহীন বা লাবণ্যহীন হয়ে পড়ে নি! একটা সবুজ ঘাসজমি আছে আমার! সেখানে শালিখ ওড়াউড়ি করে!
আকাশটা নিচুতে নেমে এসে নীল রঙ ছড়ায়!
আজ আমি মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা। কিন্তু সে দিনগুলির কথা আমি ভুলতে পারি না! নিজে আর ডুবন্ত মানুষ বলে মনে হয় না! বেয়ান জাকিয়া সুলতানা আমার কেবল বন্ধুই না! বরং আমার সঙ্গী, আমার গাইড, আমার মেন্টর। মনে মনে বলি ভালো থাকবেন বেয়ান! সব সময় সুখে থাকবেন!
যা বলছিলাম। বেলা বাড়ার সাথে সাথে লোক সমাগমও বাড়তে লাগলো। চারদিকে সোনালি রোদের ঝলকানি। মৃমৃদুমন্দ বাতাস বইছে! আমার প্রায়ই মনে হয় দুপুরের বাতাসে মন খারাপের ছোঁয়া থাকে। অলস বাতাসটা আমাকে নস্ট্যালজিক করে দেয়। এত ভিড়ের মধ্যেও আমি আমার মধ্যে একটা উদাসীভাব অনুভব করছিলাম। এভাবে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চোখে পড়লো আমাদের কাছেই একটা মেপেল গাছের দিকে। ঘন পাতায় ছাওয়া গাছটা কী সুন্দর দুলছে
বাতাসের ছোঁয়ায়! কিছু পাখিও চোখে পড়লো। গাঢ় রোদ্দুরের মাঝে ছায়া ছায়া গাছটা যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে! অদ্ভুত দুপুর নামছে মনের ভেতর! রোদ বাড়ছে কিন্তু এলোমেলো বাতাস তা বুঝতে দিচ্ছে না! বাতাসে খাবারের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। আমার বুকের ভেতরের শান্ত নদীটা যেন দুলে উঠলো অনেক দিন পর। সেই শৈশবের কালীপুজোর মেলার তেলেভাজা আর শিশির ভেজা শিউলিফুলের অদ্ভুত গন্ধটা যেন আমাকে জাগিয়ে তুলল! উষ্ণতা ছড়ালো! আমরা সবুজ ঘাসজমিতে নেমে পড়লাম। পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলাম মেপেল গাছের কাছে। আমি জানি গাছ থাকলেই পাখি থাকে! আমাদের পায়ের আওয়াজে পাখিরা পাতার আড়ালে চলে গেলো। গাছটার নিচে বসলাম। চোখে পড়লো দূরের সবুজ দিগন্তরেখা। ওদিকে তাকিয়ে মনে হলো আকাশটা আজ বিষণ্ণ। হয়তো ভুল বললাম! আকাশটা না, আমার মনটাই হয়তো বিষণ্ণ! আমি হয়তো স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েছি! রোদের সোনালি রঙটাকে তাই বেগুনি বলে মনে হচ্ছে।
মনে হলো সামনেই একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। নদীটার কাছে গেলাম না! কল্পনায় দেখলাম নদীর টলটলে পানিতে ভেসে আছে কলমি আর হেলেঞ্চার সতেজ ডগা। হাঁসেরা জলকেলিতে ব্যস্ত! হাঁসেদের জলকেলি আমার প্রিয়তম দৃশ্য। আকাশে চিল উড়তে দেখলাম।
মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইলাম সে দিকে।
এরই মধ্যে কানে আসছে বাচ্চাদের আনন্দ উল্লাস। তাকিয়ে দেখি কেবল বাচ্চারা না
বড়রাও আছে। খেলার প্রতিযোগিতা চলছে! এই উল্লাস
বলে দিচ্ছে পিকনিক কতটা জমে উঠেছে! আমি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা এড়িয়ে চলি। কারণ আমি কখনও জিততে পারি না। পিলোপাসিংয় আমি সবার আগে বাদ পড়ি। তাই ওদিকে আর গেলাম না। বসেই রইলাম গাছের ছায়ায়। আমরা ওখানেই জোহরের নামাজ পড়লাম। এরই মধ্যে ডাক পড়লো খাবার খাওয়ার। খেতে এসেই দেখা হলো অনেকের সাথে। কাছের মানুষকে পেয়ে গল্প জমে উঠলো।
দুপুরের খাবার খেতে খেতেই বেলা গড়িয়ে গেলো। সেপ্টম্বর মাসে বেলা ছোটই হয়। গল্প করছি বলে তা যেন আরও ছোট মনে হলো। আকাশের দিকে তাকালাম। নরম নীলাভ আকাশ। কম বয়সের উচ্ছ্বাসময় আবেগটা টের পেলাম। মনে হলো আমরা কেউই যেন ফুরিয়ে যাই নি! সেই আগের মতোই আছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়লো পিলোপাসিং খেলতে হবে। আমি আগেই বলেছি খেলাধুলা এড়িয়ে চলি। তাই ডাকে সাড়া দিলাম না।
আমাদের সবার জীবনেই গল্প থাকে! এত আনন্দ উল্লাসের মধ্যে কারোর সেই গল্প মনে পড়ছিলো কি না তা জানি না। তবে আমার মনে পড়ছিলো সবুজ দিগন্তরেখার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মধুমতির কথা—–বিকেলের নরম রোদমাখা ভেজা বালিয়াড়ির কথা। দুপুরের খাবার খেতে খেতেই বেলা গড়িয়ে গেলো। পিলোপাসিং খেলা এর মধ্যেই জমে উঠলো। সে এক দারুণ দৃশ্য! আমরা যারা অংশ গ্রহণ করি নি তারাও উপভোগ করছিলাম।
আস্তে আস্তে বিকেল হয়ে এলো। নিস্তেজ রোদটা ছুঁয়ে আছে আমাদের। খোলা জায়গা বলে তখনও আলো আছে। আলোটা তেমন উজ্জ্বল না। হয়তো সারাদিনের উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে বলে আলোটাকে উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল না!
খেলা শেষ হলো। আমরা বিকেলের নাস্তা খেতে ব্যস্ত। নাস্তার পরই চা খেলাম। দারুণ মজার চা। কে বানিয়েছিলো তা জানি না! তবে তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আগেই বলেছি বিকেলের আলোয় অন্ধকারের ছোঁয়া। সেই মেপেল গাছে অদ্ভুত রহস্যের আভাস! পাতাগুলি তখনও দুলছে। পাতার আড়ালে পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আমার কাছে মনে হলো মেহগিনি গাছে বসে একটা পাখি যেন ‘ টুই টুই ‘ শব্দ তুলছে। আমি ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হলাম। আসলে ভালো লাগার কোন নিয়ম থাকে না—–থাকে না কোন কারণও! যে কোন সময় যে কোন কারণে ভালোলাগা মনের মধ্যে দানা বাঁধতে পারে! এই খোলা মাঠ, অস্পষ্ট আওয়াজ, ব্যস্ত রোদ, নীলাভ আকাশ, মনের ভেতর ডেকে ওঠা পাখির ‘টুই টুই’ শব্দ
আর স্মৃতিময় দিনগুলি মিলে অদ্ভুত এক আবেশ তৈরি হয়েছিল আমার মধ্যে। আমি চাইছিলাম না এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটুক!
একটা মাত্র জীবনে সবকিছু পাওয়া যায় না! তাই যা পাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়! কী পেয়েছি আর কী পাই নি তা মেলাতে যাওয়া বোকামি। ইনফ্যাক্ট তা মেলেও না! এই তো আজ কী সুন্দর একটা দিন পেলাম! অতীত আর বর্তমানের সমন্বয়ে চমৎকার একটা দিন! এটাই বা কম কিসে!
পিকনিকের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো ঘরোয়া পরিবেশে সুস্বাদু খাবার পরিবেশন। যারা এর দায়িত্বে ছিলেন তারা ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। অনুষ্ঠান শেষে বাকোর সভাপতি আরাফাত ফয়সাল ও সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার খান সবাই ধন্যবাদ জানালেন।
আমরা ততক্ষণে চলে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছি। মনে মনে ভাবছি এ দিনটির জন্য কত গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। আজ তা শেষ হলো। ফিরে যাচ্ছি একবুক আনন্দ নিয়ে! না, ভুল বললাম! আনন্দের সাথে বিষণ্ণতার মিশ্রণও ছিলো!
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। দেখছি গাছের ফাঁকে ফাঁকে কমলা ছোপে ভরা আকাশটাকে। এতো আনন্দ তবুও মনের মধ্যে কেন যেন বিষণ্ণতার সুর বেজে চলেছে। কমলা নরম আকাশটাকে তাই মাঝে মাঝেই ঘোলাটে লাগছে! উৎসবের মাঠ ছেড়ে যাচ্ছি বলেই কি এ রকম লাগছে! মনকে বোঝালাম শেষ বলে কিছু নেই! যেখানে শেষ সেখান থেকেই শুরু! শেষের মাঝেই তো শুরুর সম্ভাবনা উঁকি দেয়! তবে আমি হয়তো থাকব না! তাতে কী! অন্য কেউ থাকবে! তারাই রাঙিয়ে তুলবে দিনটাকে! কফি হাউজের মতো আগের আড্ডাটা না থাকলেও টেবিলটা তো খালি পড়ে থাকবে না! নতুন মালি আসবে—-নতুন করে ফুল ফোটাবে! ডানার রঙ ছড়িয়ে প্রজাপতি উড়বে! কলমি আর হেলেঞ্চার সতেজ ডগা পানিতে ভাসবে! হলুদ সর্ষেফুলে ভরে উঠবে মাঠ! পাখিরা পাতার আড়ালে ভালোবাসা বিনিময় করবে! আর তারই ছোঁয়া লাগবে উৎসবমুখর মানুষের মনে।